লুমিয়ায় ধস, মাইক্রোসফটের ফোন ব্যবসা বন্ধ?

944fb337377ba0ffef6b3b61c394c7e5-nokia_lumia_520_review_7
Loading...

মাইক্রোসফটের জনপ্রিয় লুমিয়া ব্র্যান্ডের ফোন বিক্রি এক বছর আগের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাজার বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন, আর কয়দিন টিকবে মাইক্রোসফটের ফোন ব্যবসা?
বড় প্রশ্ন হচ্ছে—কী হলো নকিয়ার এক সময়ের জনপ্রিয় লুমিয়া ব্র্যান্ডের ফোনের? মাইক্রোসফটের হাতে আসার পর থেকে বাজারে ক্রমশ বিক্রি কমে যাচ্ছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা ‘মৃত ফোন’ বলে আখ্যা দিতে শুরু করেছেন। গুঞ্জন উঠেছে লুমিয়া ব্র্যান্ডটিকে আর চালাবে না মাইক্রোসফট। আসবে মাইক্রোসফটের নিজস্ব ‘সারফেস’ ফোন। |
গতকাল বৃহস্পতিবার মাইক্রোসফট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০১৪ সালে যত লুমিয়া ফোন বিক্রি হয়েছে, ২০১৫ সালে এসে তার অর্ধেক হ্যান্ডসেট বিক্রি হয়েছে। শিগগিরই লুমিয়া ফোন বিক্রি বেড়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা লুমিয়া ফোনের তাই ‘ভারচুয়াল ডেথ’ ঘোষণা করে দিয়েছেন।
প্রান্তিক আয় ঘোষণার সময় মাইক্রোসফট জানিয়েছে, বছরের শেষ প্রান্তিক, অর্থাৎ, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে ৪৫ লাখ ইউনিট লুমিয়া ফোন বিক্রি হয়েছে, যা এক বছর আগের ওই সময়ের তুলনায় ৫৭ শতাংশ কম। ২০১৪ সালের শেষ প্রান্তিকে এক কোটি পাঁচ লাখ ইউনিট লুমিয়া ফোন বিক্রি হয়েছে। মাইক্রোসফটের ফোন বিক্রি যেমন কমেছে, তেমনি লাভের পরিমাণও ৫৩ শতাংশ কমেছে। মাইক্রোসফটের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা অ্যামি হুড বাজার বিশ্লেষকদের কাছে ফোনের আয় আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ বছরের মার্চ মাস নাগাদ মাইক্রোসফটের ফোন ব্যবসা থেকে লাভ আসবে ৬৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার মাত্র; যা বাজারে বিলীন হতে বসা ব্ল্যাকবেরির চেয়ে মাত্র তিন গুণ বেশি। গত নভেম্বরে ব্ল্যাকবেরি বাজারে টিকে থাকতে তাদের পরিকল্পনার ব্যাপক রদবদল করেছে। এখন নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম বাদ দিয়ে অ্যান্ড্রয়েড ফোন তৈরি করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে ব্ল্যাকবেরি। মাইক্রোসফটের অবস্থা হয়তো এখনই ব্ল্যাকবেরির মতো হচ্ছে না। তবে তা হতে কত দেরি?
বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ৭২০ কোটি মার্কিন ডলারে নকিয়াকে কিনে তার পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করে মাইক্রোসফট হা-হুতাশ করছে। এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপল আইফোন বিক্রি করে ১ হাজার ৮৪০ কোটি মার্কিন ডলার মুনাফা করেছে। মাইক্রোসফট প্রতি প্রান্তিকে শুধু নিজের ইকোসিস্টেম তৈরির সম্ভাবনাকে কাজে না লাগানোর বিষয়টি ধীরে ধীরে মলিন হয়ে যেতে দেখছে!

লড়াই করছে মাইক্রোসফট২০১৩ সালের এপ্রিলে বাজারে আসা লুমিয়া ৫২০ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় লুমিয়া ফোন
গত প্রান্তিকে ফোন ব্যবসা থেকে আশানুরূপ আয় না হওয়ায় মাইক্রোসফটের ডিভাইস থেকে আসা মুনাফার পরিমাণ এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ কমেছে। তবে সারফেস ব্র্যান্ডের ট্যাবলেটের ব্যবসায় ভালো করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সারফেস প্রো ৪ ও সারফেস বুক ট্যাব বিক্রি করে ১৩৫ কোটি মার্কিন ডলার মুনাফা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের নিয়ে প্রান্তিক আয় ঘোষণার সময় মাইক্রোসফটের ফোন ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেননি। সবাই মাইক্রোসফটকে গত প্রান্তিকে ভালো করার জন্য প্রশংসা করেছেন। কেন?
মাইক্রোসফট তাদের উইন্ডোজ ১০ সফটওয়্যার নিয়ে যে আগ্রাসী প্রচার চালাচ্ছে, তাতে ইতিমধ্যে ২০ কোটি যন্ত্রে এই সফটওয়্যার ইনস্টল হয়ে গেছে বলে মাইক্রোসফট দাবি করেছে। গত বছরের জুলাই মাসে এ সফটওয়্যার উন্মুক্ত করে মাইক্রোসফট।
গত প্রান্তিকে সব মিলিয়ে ৫০০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে মাইক্রোসফট। যদিও পণ্য বিক্রি ও আয়ের দিক থেকে গত বছরের চেয়ে এ বছর মাইক্রোসফট পিছিয়ে রয়েছে, তবু আয়ের দিক থেকে ওয়াল স্ট্রিট বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো করায় প্রশংসা পেয়েছে মাইক্রোসফট। ক্লাউড কম্পিউটিং, পিসি সফটওয়্যার, সারফেস ট্যাব ও এক্সবক্স গেম কনসোল মাইক্রোসফটকে টেনে তুললেও ডুবিয়েছে ওই ‘লুমিয়া’।
নতুন ফোনের আগমনী
অ্যান্ড্রয়েডনির্ভর ফোন নির্মাতারা এবং অ্যাপল যখন স্মার্টফোনের বাজারে লড়াই করছে, সেখানে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ ফোনের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফেব্রুয়ারিতে স্পেনের বার্সেলোনায় অনুষ্ঠেয় মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে কোনো নতুন ফোন প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুতি নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি ‘সারফেস’ ব্র্যান্ডের একটি ফোন ছাড়া বাজারে নতুন উইন্ডোজ ফোন নিয়ে গুঞ্জনও নেই। প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট অ্যাডডুপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের এপ্রিলে বাজারে আসা লুমিয়া ৫২০ এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় লুমিয়া ফোন।
বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সারফেস ফোনের গুঞ্জন সত্যি হবে। মুর ইনসাইটস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির বিশ্লেষক প্যাট্রিক মুরহেড বলেন, আমার মনে হয়, মাইক্রোসফটের সারফেস টিম সারফেস প্রো-ট্যাবের মতোই ভিন্নধারায় একটি ফোন তৈরি করবে। উইন্ডোজ ১০ অপারেটিং সিস্টেমচালিত ও কন্টিনিয়াম ফিচারযুক্ত সারফেস ফোনের ভবিষ্যৎ আছে।
মাইক্রোসফট অবশ্য কখনো ফোনের ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি। এ ক্ষেত্রে মাইক্রোসফটের যে দুর্দশা যাচ্ছে, তা সবারই জানা। উইন্ডোজ ফোনে অ্যাপের ঘাটতি আছে। উইন্ডোজ ১০ তৈরি করা হয়েছে সীমিতসংখ্যক উইন্ডোজ ফোনের মডেলের কথা ভেবে। মুরহেডের মতে, আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েড থেকে অ্যাপ উইন্ডোজ ফোনে টেনে আনার কোনো প্রযুক্তি এখনো মাইক্রোসফটে দেখা যায়নি। এ ছাড়া লুমিয়ার যে ফিচার, তা অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে সহজলভ্য হয়ে গেছে। মাইক্রোসফটও এই দুই প্ল্যাটফর্মের জন্য অ্যাপ তৈরি করে দিচ্ছে।
কোনো পণ্যের সুখ্যাতি সে পণ্যকে তুলে আনতে পারে আর দুর্নাম সেটিকে ডোবাতে যথেষ্ট। যখন কোনো ব্র্যান্ড ব্যর্থ হয়ে পড়ে, তখন তার জন্য সেটাই যথেষ্ট। মাইক্রোসফট লুমিয়া লাইনকে শেষ করে দেয়নি। কোনো মিডিয়া বা কোনো বিক্রেতাও লুমিয়াকে ডোবায়নি। ক্রেতারাই উইন্ডোজ ফোনকে পাশ কাটিয়ে গেছেন।

পোষ্টটি লিখেছেন: বিশ্ব বিবেক

বিশ্ব বিবেক এই ব্লগে 3297 টি পোষ্ট লিখেছেন .

Loading...
পোস্টটি ভাল লাগলে লাইক দিন