হোম » বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি » পৃথিবীতে প্রাণের সূত্রপাত ও পরিণতি: অমীমাংসিত রহস্য
পৃথিবীতে প্রাণের সূত্রপাত ও পরিণতি: অমীমাংসিত রহস্য

পৃথিবীতে প্রাণের সূত্রপাত ও পরিণতি: অমীমাংসিত রহস্য

আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি সে পৃথিবীতে কীভাবে আমাদের তথা জীবদের আবির্ভাব ঘটল তার রহস্য উদঘাটনে মানুষের প্রচেষ্টার অন্ত নেই। প্রাচীনকাল থেকেই নানা প্রবাদ, নানা তত্ত্ব, নানা ধারণা মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের যুগে বাস্তববাদী মানুষ প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছুই বিশ্বাস করতে আগ্রহী হয় না। সে জন্য জীবনের রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টাও অব্যাহত আছে।

১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে চার্লস্ ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বটি ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত হয়। বিবর্তনবাদ তত্ত্বে ডারউইন যেটা বলতে চেয়েছেন তার সারকথা হল, এক প্রজাতি সময়ের বিবর্তনে অন্য প্রজাতিতে রূপান্তরিত হয়। ১৮৬০ সালে ফ্রান্সের রসায়নবিদ লুই পাস্তুর তার গবেষণায় ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বের বিপরীত ফলাফল দেখতে পান।

পাস্তুর বলেন যে, তার গবেষণার ফলাফল সৃষ্টিকর্তা যে জীবন সৃষ্টি করেছেন এ সংক্রান্ত বিশ্বাসকে সমর্থন করে। কোনো জড় পদার্থ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জীবনের আবির্ভাব ঘটেনি বরং কোনো সৃষ্টিকর্তার সহায়তায় তা ঘটেছে। উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের প্রারম্ভে বিজ্ঞানীরা যখন কোষের জিনগত এবং জৈব রাসায়নিক জটিলতা নিয়ে গবেষণা করছিলেন তখন তারা একটি সমস্যা দেখতে পান। সমস্যার একটি দিক ছিল যে, জীবনের আবির্ভাব কখনই ঘটেনি বরং তা মহাবিশ্বের অংশ হিসেবে সবসময় ছিল।

‘পৃথিবীতে জীবনের সূত্রপাত: একটি ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক সাধারণ ধারণা’ গ্রন্থের লেখক এবং ইজরাইল প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের জীব বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ আইরিশ ফ্রাই বলেন, ‘মহাবিশ্ব ও বস্তুকে অবিনশ্বর বলে ধরে নেয়া যায়।’ জার্মানীর ভন হেলমোজ, ইংল্যান্ডের লর্ড কেলভিন, সুইডেনের সোভনটে আরহেনিয়াস ধারণা দেন যে, জীবনের মূল উপাদান বা বীজ মহাবিশ্বের সর্বত্র বিচরণ করে এবং উপযুক্ত পরিবেশে বিকশিত হয় যা ‘Panspermia hypothesis’ নামে পরিচিত।

আরহেনিয়াস ও তার সহযোগীরা আরো বলেছিলেন, সৌরশক্তির বিকিরণের মাধ্যমে স্পোর হিসেবে রক্ষিত জীবনের বীজ এ গ্রহে প্রবেশ করেছিল।

ইতিহাসবিদ ফ্রাই বলেন, ‘Panspermia তত্ত্বটি জীবনের সূত্রপাতের ইতিহাসকেই অস্বীকার করে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের অবিনশ্বরতাই বিশ্বাস করেন না। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, মহাবিশ্বের একটি শুরু ছিল এবং তা ধ্বংসও হবে।’

বর্তমানে বেশিরভাগ বিজ্ঞানী বলছেন, জড় পদার্থ থেকে জীবনের সূত্রপাত হয়েছে যা ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনকে সমর্থন করে। পবিত্র আল কুরআনের সুরা ত্ব-হার ২২নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি মাটি থেকেই তোমাদের সৃষ্টি করেছি’। সুরা মুমিনুনের ১২, ১৩, ১৪, ১৫ ও ১৬নং আয়াতেও মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করার কথা বলা আছে। কিছু কিছু বিজ্ঞানী গ্রহ থেকে গ্রহে জীবনের স্থানান্তর ব্যাখ্যা করতে বর্তমানে Transpermia অভিধাটি ব্যবহার করছেন। ফ্রাই Panspermia অপেক্ষা Transpermia তত্ত্বটি বেশি পছন্দ করেন কারণ তা জীবনের আবির্ভাব সংক্রান্ত পুরোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে। কিছু কিছু পরীক্ষা থেকে এটা তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে বায়ুশূণ্য বিশ্বে জীবনের অস্তিত্ব বজায় থাকা সম্ভব হবে না। তখন অন্য সুবিধাজনক গ্রহে জীবনের স্থানান্তর হওয়া অসম্ভব নয়। পবিত্র আল কুরআনেও মানুষের অন্য জগতে পুনরাবির্ভাবের কথা বলা আছে।

ম্যাসাচুচেটস্ হাসপাতাল ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেলজয়ী অনুজীব বিজ্ঞানী জ্যাক জসট্যাক তার ল্যাবরেটরিতে চার বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে জীবনের আবির্ভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। অধ্যাপক জসট্যাক ‘টেলোমারেজ’ নামক এনজাইম আবিষ্কার করে বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। টেলোমারেজ এমন একটি পদার্থ যা DNA কে রক্ষার পাশাপাশি তাকে দীর্ঘায়ু করতেও কাজ করে। ১৯৮০ সালের এ কাজের জন্য জসট্যাক ২০০৯ সালে মেডিসিনে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। DNA আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন অন্তত এমন আনবিক যন্ত্রের দেখা পাওয়া গেল যা নিজেই নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে প্রজাতির বিকাশে ভূমিকা রাখবে। তখনও বহুল আলোচিত প্রথম প্রশ্ন, কীভাবে জীবনের সূত্রপাত হল তা অমীমাংসিতই রয়ে গেল।

Untitled-02১৯৫৩ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন গবেষক স্টানলি মিলার এবং হ্যারোল্ড উরেই একটি বিখ্যাত পরীক্ষা পরিচালনা করেন। বদ্ধপাত্রে পানি, মিথেন, অ্যামোনিয়াসহ পৃথিবী গঠনের মৌলিক রাসায়নিক কিছু পদার্থ নিয়ে তাপ প্রয়োগ করে তড়িৎদ্বারে আলো সঞ্চালন করেন। তারা দেখতে পান সাধারণ উপাদানগুলো অ্যামাইনো এসিডসহ জটিল সব অনু তৈরি করছে যা কোষের প্রোটিন গঠনে সহায়ক। তবুও জীবনের রহস্য উন্মোচনে তা স্পষ্ট কোনো ধারণা দেয় নাই। প্রথমদিকে যে সমস্যাটা দেখা দেয় তা হল সেই ঐতিহাসিক ডিম আগে না মুরগি আগে সমস্যা। প্রতিটি কোষেই DNA থাকে যা RNA নামক প্রোটিন গঠনকারী উপাদানের সাহায্যে সংকেত কোষের প্রতিটি অংশে পৌঁছায়। DNA এর কার্যাবলী ও অনুলিপিকরণসহ কোষের প্রত্যেকটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রোটিন অত্যাবশ্যক। অধ্যাপক জসট্যাক বলেন, ‘প্রতিটি উপাদানই প্রতিটি উপাদানের ওপর নির্ভরশীল।’

কোনো উপাদানটি আগে আসে এ সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৭০ সালে বিজ্ঞানীরা নতুন ধারণার সূত্রপাত করেন। তাদের মতে, আমরা যে জীবন নিয়ে কথা বলছি তা শুধু RNA এর উপর নির্ভরশীল। RNA একদিকে যেমন নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে অন্যদিকে আদি কোষের প্রয়োজনীয় ক্রিয়া সম্পাদনে রাসায়নিক প্রভাবক হিসেবেও কাজ করতে পারে। RNA কীভাবে কাজ করে তা প্রমাণ করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। জসট্যাকের ল্যাবরেটরি প্রথম যে বাধার সম্মুখীন হয় তা হল প্রথম RNA অণুর অনুলিপি কীভাবে হয় তা প্রমাণ করা। প্রথম যে বাধাটি আসলো তা হল যে রাসায়নিক উপাদানগুলো RNA কে কাজ করতে সাহায্য করে তারাই আবার জঘঅ কে বেস্টনকারী ফ্যাটি অ্যাসিডের পর্দা ধ্বংস করার প্রবণতা দেখায়। ফলে প্রক্রিয়াটি শেষ হয়ে যাবার কথা।

গত নভেম্বরে জসট্যাক ও তার সহয়োগীরা জানান, সাইট্রিক অ্যাসিডের সঙ্গে সম্পর্কিত সাইট্রেট ফ্যাটি অ্যাসিডের পর্দাকে রক্ষা করে আদিকোষের কোনো ধ্বংস ছাড়াই RNA এর অনুলিপিকরণ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করে। জসট্যাক আশাবাদী যে, তার গবেষণায় জীবনের রহস্য উদঘাটিত হবে। কিন্তু পৃথিবীতে জীবনের সূত্রপাতের রহস্যময়তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে নাকি নতুন কোনো রহস্যের আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে তা জানার জন্য মানবকূল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

লেখক: মাহবুব কবীর পরাগ
সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা।
বিএসসি (সম্মান), এমএস (জৈব রসায়ন),
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: paragdu@yahoo.com

পোষ্টটি লিখেছেন: Ayon Hasan

Ayon Hasan এই ব্লগে 135 টি পোষ্ট লিখেছেন .

Close [X]