দুই শিশু হত্যা মায়ের অবিশ্বাস্য স্বীকারোক্তি শুনলে আপনার চোখে পানি চলে আসবে

সন্তানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদস্থল মায়ের আঁঁচল। যে কোন ঝড়-ঝঞ্জা, আপদ-বিপদ থেকে মা-ই আগলে রাখেন সন্তানদের। সেই মা কি কখনো তার নিজ হাতে সন্তানদের হত্যা করতে পারেন? রাজধানীর বনশ্রীতে দুই শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র‌্যাবের কাছে এমন এক অবিশ্বাস্য স্বীকারোক্তি দিলেন মা জেসমিন।

র‌্যাব জানায়, দুই শিশু নুসরাত জাহান অরণী (১২) ও আলভী আমানকে (৬) তাদের মা মাহফুজা মালেক জেসমিনই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। র‌্যাবের দাবি পারিবারিক সংকট, মানসিক অবসাদ ও সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে জেসমিন তার দুই সন্তানকে হত্যা করেছে। র‌্যাব বলছে, পৃথিবীতে এমন মাও আছেন যার কাছে সন্তান নিরাপদ নয়! তবে হত্যার নেপথ্যে পিতামাতার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ থাকতে পারে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আশঙ্কা করছে। শিশু দুটির বাবা ব্যবসায়ী আমানুল্লাহ এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জানতো কিনা এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাকেও সন্দেহের তালিকায় রাখছে র‌্যাব।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে দুই শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে র‌্যাব। র‌্যাব জানিয়েছে, স্বীকারোক্তির সময় সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন হত্যাকারী মা। হত্যাকাণ্ডের পর পরিকল্পিতভাবে হত্যার দায় থেকে রেহাই পাওয়ার পরিকল্পনাও করেন তিনি। এমনকি ময়না তদন্তের পর লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কবরও দিয়ে দেয় শিশু দুটির মা-বাবা।

র‌্যাব বলছে, হত্যার পর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু মা যে তার দুই শিশুকে হত্যা করতে পারে সেটা তাদের কল্পনাতেও ছিলো না। তবে র‌্যাবের কৌশলী জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে প্রকৃত হত্যাকারীর মুখোশ উম্মোচিত হয়ে যায়। মাহফুজা স্বীকার করেন, তার দুই সন্তানকে তিনিই হত্যা করেন।

র্যাব জানায়, তদন্তকালে আমরা প্রথমে ডাকি শিশু দুটির গৃহশিক্ষক, মামা, কাজিন ও কেয়ার টেকারকে। তবে আমাদের ধারণাতেই ছিল না এ ঘটনায় বাবা-মা জড়িত। তদন্তের স্বার্থে আমরা তাদের বাড়ি থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করি এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করি।

র্যাব জানায়, হত্যার বর্ণনা দিয়ে মাহফুজা বলেন, ঘটনার দিন সোমবার ছেলে ঘুমিয়ে ছিল তার সঙ্গে। আর মেয়ে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ছিল। শিক্ষক চলে গেলে মাহফুজা তার মেয়েকে ডেকে তার রুমে বিশ্রাম নিতে বলে। কিছুক্ষণ পর মেয়ের গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ধরেন তিনি।

র্যাব জানায়, মায়ের ওই ওড়না অরণী শখ করে পড়তো। ওই সময় অরণী বলে, মা তুমি আমাকে মারছ কেন? জীবন বাঁচাতে ছটফট করতে থাকে সে।

র্যাব আরো জানায়, ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে অরণী মাটিতে পড়ে যায় এবং মুখে আঘাত পায়। এরপর বুকের উপরে উঠে জেসমিন অরণীর গলা টিপে ধরে। এরপর আরো কিছুক্ষণের প্রচেষ্টায় অরণীর মৃত্যু হয়। এরপর একইভাবে ঘুমন্ত আলভীকে তিনি হত্যা করেন। এসময় শিশুদের দাদী দুইবার এসে দরজার কড়া নাড়েন। এরপর মাহফুজা সুকৌশলে তার স্বামীকে ফোন করে জানায় তার দুই ছেলেমেয়ে অসুস্থ। তার স্বামী তখন তার বন্ধুকে দ্রুত বাসায় পাঠায়।

র্যাব বলছে, তখন জেসমিন দ্রুত দুই শিশুকে রাজধানীর আল রাজী হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিত্সকরা বাচ্চাদের মৃত ঘোষণা করেন। এরপর তিনি সবার কাছে প্রচার করেন যে, তাদের ১৪তম বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে আগের দিন চাইনিজ রেস্টুরেন্ট থেকে আনা ফ্রিজের খাবার খেয়ে তার দুই সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই খবর মিডিয়াতেও প্রচার হয়েছিলো; কিন্তু পরদিন ময়না তদন্তে শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনাটি স্পষ্ট হয়ে যায়।

এর আগে বুধবার বেলা ১১টায় জামালপুর শহরের নতুন হাইস্কুল মোড় এলাকার একটি বাসা থেকে মা জেসমিন ও বাবা আমান উল্লাহ এবং খালা মিলিকে আটক করে র্যাব-৩-এর একটি টিম। জামালপুরের ওই বাসাটি জেসমিনের বাবার বাড়ি।

পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।

ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার দুপুরে চিকিত্সকরা বলেন, অরণী ও আলভীর গলায় আঙুলের ছাপ, শরীরের কয়েক স্থানে আঘাতের চিহ্ন ও জখম আছে। শ্বাসরোধ করে দুই শিশুকে হত্যা করে হয়েছে বলে চিকিত্সক ময়নাতদন্তে উল্লেখ করেন।

প্রথম থেকেই শিশু দুটির বাবা-মার আচরণ ছিল রহস্যজনক। তারা দুজনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে সন্তানদের লাশের কাছে না গিয়ে গ্রামের বাড়ি জামালপুরে চলে যান। তারা লাশের ময়নাতদন্ত করতেও রাজি ছিলেন না। পুলিশের চাপের মুখে সম্মতি দেন।

র্যাব জেসমিনকে কেন নিজের সন্তানদের হত্যা করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। একটি কলেজে দুই বছর শিক্ষকতাও করেছি। আমার মনে হয়েছে ওরা বড় হয়ে ভালো কিছু করতে পারবে না। তাই আমার সন্তানদের আমিই মেরে ফেলেছি।

র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, মা তার নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারে এটা আমাদের প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। তবে সত্য বড় কঠিন। আমরা দাদীর কথা অনুযায়ী শিশু দুটির মাকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছিলাম। সেটিই সত্যি হলো।

বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় কোন পর্যায়ে গেছে এই দুই শিশু হত্যার মধ্য দিয়ে আবার দেখা গেল। ধর্ম ও বিজ্ঞান বলছে, মায়ের কাছে তার সন্তান সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু এই ঘটনায় সেটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। গভীরভাবে এই ঘটনার তদন্ত হওয়া দরকার।

মা-বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে র্যাব গতকাল সন্ধ্যায় তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। রাতেই রামপুরা থানায় দুই শিশু হত্যাকাণ্ডে মা জেসমিনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়।

আজকের আলোচিত পোষ্ট:

পোষ্টটি লিখেছেন: বিশ্ব বিবেক

বিশ্ব বিবেক এই ব্লগে 3317 টি পোষ্ট লিখেছেন .

Loading...
পোস্টটি ভাল লাগলে লাইক দিন