সব স্কুল কলেজ একসাথে জাতীয়করণ

Loading...

 

 

এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ-এ সময়ের বহুল আলোচিত একটি ইস্যু। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে এ আলোচনাটি কেন জানি বেশ জোরেসোরেই সকলের সামনে চলে আসে। এ সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণ ও তখন এ বিষয়ে অতি উৎসাহী হয়ে ওঠেন। জাতির জনকের শাসনকালে ৩৭০০০ প্রাইমারি স্কুল একসাথে জাতীয়করণ ও তাঁর তনয়া শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদে আরো ২৬০০০ রেজিস্টার্ড ও কমিউনিটি প্রাথমিক স্কুল একত্রে সরকারিকরণ এবং শিক্ষক ও শিক্ষার মান উন্নয়নে তাঁদের গৃহীত অন্যান্য পদক্ষেপের কারণে স্কুল-কলেজ জাতীয়করণের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা সঙ্গত কারণে বেশী থাকে।
স্কুল-কলেজ জাতীয়করণের বিষয়ে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার কোনো অভাব নেই। কেবল জাতীয়করণের কৌশলের সাথে অনেকের ভিন্ন মত। দেশের সর্বত্র ইদানিং কানাঘুষা চলমান যে, ২০১৮ সালের মধ্যে সরকার নাকি সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে ফেলবে। এ বিষয়ে কেউ কেউ শতভাগ আশাবাদী। সরকার ভেতরে ভেতরে হয়তো বা এ রকম একটা প্রস্তুতি নিয়েই নিয়েছে। কেবল একটা সারপ্রাইজ দেবার জন্য বিষয়টি গোপন রাখা হচ্ছে কীনা, কে জানে? দেশ এগিয়েছে অনেক। এ পর্যায়ে এসে ও স্কুল-কলেজ সরকারি না হলে আমাদের মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি কে দেবে? আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা শুনে একদিন অনেকে তা হেঁসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু, আজ সেটি বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সরকার ইদানিং বিক্ষিপ্ত ভাবে স্কুল-কলেজ জাতীয়করণের যে কর্মসূচি শুরু করেছে, তা নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে চলেছে।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে ১৯৯ টি কলেজ এবং গত সপ্তাহে ৭৯ টি স্কুল জাতীয়করণের তালিকা প্রকাশিত হবার পর সারা দেশ জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। জায়গায় জায়গায় কোথাও আনন্দ-উচ্ছাস, মিষ্টি বিতরণ আবার কোথাও জাতীয়করণের দাবিতে মানববন্ধন, আধাবেলা হরতাল ইত্যাদি আরো কত কী! আরো প্রায় আড়াইশ’ স্কুল ও একশ’-র ওপরে কলেজ এভাবে বিক্ষিপ্ত জাতীয়করণের অপেক্ষায়।এ গুলোর তালিকা প্রকাশের পর আনন্দের পাশাপাশি ক্ষোভ আরো কয়েকগুণ বাড়ে কীনা, কে জানে?
বেসরকারি স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ইত্যাদিতে সরকারি তত্ত্বাবধান ও নজরদারি তুলনামূলক কম থাকার কারণে এসবের বেশীর ভাগ তাদের ইচ্ছা মাফিক পাঠক্রম ও পাঠ্যসূচি অনুসরণ করে থাকে। এ সব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো শিক্ষার্থীর বিপথগামী হবার প্রমাণ গুলশান ট্র্যাজেডি ও শোলাকিয়ার ঈদের জামাতে হামলার পর আমাদেরর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।
আমাদের শিক্ষার দৈন্যদশা ও দূরবস্থা নিয়ে কম বেশী সকলে উদ্বিগ্ন। নোট-গাইড আর কোচিং বাণিজ্যে নাকাল আমাদের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীগণ।এ সব থেকে জাতিকে পরিত্রাণ দিতে একত্রে সকল স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
আমাদের শিক্ষা নিয়ে কতো রকম বাণিজ্য হয়। স্বীকার না করে কারো উপায় নেই যে, শহরের নামী-দামী কিংবা ইংলিশ মিডিয়াম অনেক স্কুল-কলেজে গলাকাটা ফি আদায় করা হয়। ভর্তি বাণিজ্যের নামে কেউ কেউ কোটি টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে সেশন ফি, পরীক্ষা ফি এমনকি মাসিক টিউসন ফি পর্যন্ত সাধারণের নাগালের বাইরে। শিক্ষা বাণিজ্য আজ অনেকের কাছে খুব লাভজনক একটি কারবার।

কোনরুপ লোকসানের ঝুঁকি নেবার প্রয়োজন পড়েনা। শহরের অলিতে গলিতে, বিপণী বিতানে, হোটেল-রেঁস্তোরার উপরে কিংবা নীচে স্কুল না হয় কলেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। নানা পণ্য কিংবা কোম্পানীর মালামালের বিজ্ঞাপনের সাথে শহরের দৃশ্যমান স্থানগুলোতে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিলবোর্ড ও ব্যানার শোভা পায়। প্রচারে থাকে নানা অফার। শিক্ষা যেন আজকাল নিরেট এক লাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নানা অনিয়ম। কমিটির সদস্যগণের জায়গায় জায়গায় কত দৌরাত্ম্য!

সে এক আমলে কমিটির লোকজন নিজেরা না খেয়ে স্কুল-কলেজ চালিয়েছেন। এখন তাদের অনেকের সে মন মানসিকতা নেই। উল্টো টু-পাইস কামাবার ফন্দি ফিকির। কেবল গ্রুপিং আর দলাদলিতে কোনো কোনো জায়গায় লেখাপড়া শিঁকেয় ওঠবার অবস্থা ।
সকল স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ না হলে আমাদের দেশে বৈষম্যমূলক শিক্ষার অবসান হবেনা। বৈষম্যমূলক শিক্ষা উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়-সে সত্যটি সকলের উপলব্ধির সময় এসেছে। এ দেশে সর্বপ্রথম বৈষম্যমূলক শিক্ষার বীজ বপন করে ইংরেজ সরকার।

এখনকার মতো সেকালেও সমাজের অভিজাত শ্রেণি জেলা সদর বা শহরে বসবাস করতো। এ ছাড়া সরকারের পদস্থ সব লোকজন ও থাকতো শহরে। এদের সন্তানদের কথা ভেবে এবং সমাজের অভিজাত ও জমিদার শ্রেণিকে হাত করার জন্য বৃটিশ সরকার জেলা ও কোনো কোনো মহকুমা সদরের স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ করে।

গ্রামে দিনরাত পরিশ্রম কিংবা চাষাবাদ করে দেশকে বাঁচায় যারা-তাদের সন্তানের কথা তখন কেউ ভাবেনি। আজ ও যেন তাই! এখনো জাতীয়করণের প্রশ্নে জেলা সদর কিংবা উপজেলায় অবস্থিত স্কুল-কলেজকেই অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়। সে যেন ‘ধনী আরো ধনী আর গরীব আরো গরীব হবার নীতি’র সযত্ন অনুশীলন।

তাই তো শহরে আর গ্রামে নানা দিক থেকে বৈষম্যের পাহাড় দিনে দিনে কেবল বেড়েই চলেছে। আমাদের বোধগম্য হয় না যে, কেনো আজো বৃটিশ শাসনামলের স্টাইলে স্কুল-কলেজ জাতীয়করণে কেবল জেলা সদর ও উপজেলায় অবস্থিত স্কুল-কলেজ বেছে নেয়া হয়?
বিক্ষিপ্ত করে জাতীয়করণে কতো অনিয়ম! কোথাও কোথাও কোনো নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের তালিকায় চলে এসেছে। কেবলমাত্র পাঠদানের অনুমতি কিংবা স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কোনো কোনো স্থানে অনেক প্রাচীন ও সকল শর্ত পূরণ করা প্রতিষ্ঠানকে টপকে পেছনে ফেলে জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। খোদ মন্ত্রণালয় পর্যন্ত এ নিয়ে বিব্রত।

এ সব কেন ও কী করে হয়? সব স্কুল-কলেজ একত্রে জাতীয়করণ করা হলে এ সবের সুযোগ থাকে না।
সকল স্কুল-কলেজ জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে এলে সারা দেশে এক ও অভিন্ন কারিকুলামের অধীনে পড়ালেখা চলবে। একটা যুগোপযোগী ও মানসম্মত কারিকুলামের অধীনে আমাদের নতুন প্রজন্ম শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে। ঐশীর মতো মানসিক বিকারগ্রস্ত এমন কোনো সন্তান আমাদের কাম্য নয়, যে কীনা লেখাপড়া করে ও নিজের বাবা-মাকেই হত্যা করবে। আমাদের প্রচলিত ধারার শিক্ষা অর্জন করেই তো কেউ কেউ আইএস জঙ্গি হয়ে যাচ্ছে। মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার সুযোগ দিনে দিনে যেন সীমিত হয়ে যাচ্ছে আমাদের শিক্ষায়।
আমরা যে যাই বলিনা কেন, আমাদের স্কুল-কলেজগুলো জাতীয়করণ না হবার কারণে তাতে সর্বক্ষেত্রে বিশেষ করে আর্থিক বিষয়ে অস্বচ্ছতার সুযোগ থেকেই যায়। সকল স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ করে তাতে সর্ববিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। আর তাহলে আমাদের নীতি-নৈতিকতার ও উন্মেষ ঘটবে।
‘কেউ খাবে আর কেউ চেয়ে দেখবে’ -তাতো হতে পারেনা।’কারো পৌষ মাস আর কারো সর্বনাশ’- সে তো মেনে নেয়া বড় কঠিন। প্রতিটি উপজেলায় একটি স্কুল ও একটি কলেজ জাতীয়করণ করে কী লাভ হবে? এ ভাবে হলে কেবল স্বচ্ছল ও সামর্থবান মানুষের ছেলেপিলেরা লেখাপড়ার অবারিত সুযোগ পাবে। পক্ষান্তরে, গ্রামের দরিদ্র জনমানুষের সন্তানেরা এ সব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
একদা সামন্ত যুগে লেখাপড়ার সুযোগ সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। কেবল সমাজের অভিজাত শ্রেণি পড়ালেখার অবাধ সুযোগ সুবিধা পেতো। দরিদ্র বা সাধারণ শ্রেণির জন্য লেখাপড়ার দ্বার রুদ্ধই ছিল। আমরা যদি সেদিকে ফিরে যেতে না চাই, তবে সময় এসেছে সব স্কুল-কলেজ একত্রে জাতীয়করণ করে সকলের জন্য শিক্ষার দ্বার একেবারেই উন্মুক্ত করে দেয়া।
আমাদের বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা নানা অনিয়ম ও দূর্নীতিতে অপচয় হয়। এ সব বন্ধ করতে পারলে আমাদের সকল স্কুল-কলেজ একত্রে জাতীয়করণ করা কোন ব্যাপারই নয়।

অন্ততঃ বর্তমান সরকার তা করতে না পারলে আর কারো পক্ষে তা কোনদিন সম্ভব হবে কী-না, কে জানে? একত্রে সব স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ করতে না পারলে ও এক সাথে ঘোষণা দিয়ে তিনধাপে তা কার্যকর ও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। ১৯৭১ সালের পূর্বে যে সকল স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত সেগুলো প্রথম ধাপে, ১৯৭১ সালের পরে ও ২০০০ সালের পূর্বে প্রতিষ্ঠিতদের দ্বিতীয় ধাপে এবং তৎপরবর্তি বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহ শেষ অর্থাৎ তৃতীয় ধাপে জাতীয়করণ কার্যকর করা যায় । জাতীয় প্রয়োজনে জাতির জনকের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রি জননেত্রি শেখ হাসিনা অবিলম্বে সে ঘোষণা দিয়ে জাতিকে আবারো কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করবেন-এটিই সকলের দৃঢ় বিশ্বাস।

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী
লেখক: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট।

পোষ্টটি লিখেছেন: বিশ্ব বিবেক

বিশ্ব বিবেক এই ব্লগে 3297 টি পোষ্ট লিখেছেন .

Loading...
পোস্টটি ভাল লাগলে লাইক দিন