শিক্ষা ব্যাবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসছে,সরকার নির্ধারণ করবে জিপিএ ৫

Loading...

মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসছে। কারিকুলাম, পরীক্ষা, পাঠ্যবই ও শিক্ষার্থী মূল্যায়ন – এ চার পদ্ধতিতেই মূল পরিবর্তন আসছে। মূল্যায়ন ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। শুধু নম্বরের ভিত্তিতে নয়, সরকার নির্ধারণ করে দেবে জিপিএ-৫-এর সংখ্যা। কারিকুলাম, পাঠ্যবই ও পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের অগ্রগতি পর্যালোচনায় আজ বৃহস্পতিবার বৈঠক বসছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারিকুলাম, পাঠ্যবই আর পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিই নয়, শিক্ষার অন্যান্য দিকেও পরিবর্তন আসছে। সবকিছুই করা হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নতির জন্য।

তবে, অভিযোগ রয়েছে, কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে কর্মরত কতিপয় প্রশাসন ক্যাডার ও শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত শিক্ষক বিদেশ ঘুরে আসেন। ফলে বিদেশ থেকে ধার করা ওইসব পদ্ধতি অনেক সময় ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। যে দেশে পাবলিক পরীক্ষাই নেই সেই দেশেই লটবহর যাচ্ছেন পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি দেখতে!

মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারকরা অবশ্য বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় ঘন ঘন পরিবর্তনের কোনো ঘটনা নেই। ১৯৯৬ সালের পর ২০১২ সালে কারিকুলাম পরিবর্তন হয়েছে। পাঠ্যবইও নতুন হয়েছে দু’বার। পাঠ্যবইয়ে মাঝখানে যা হয়েছে তা শুধু ইতিহাস বিকৃতি দূরের কাজ। সেটা একটা বড় কাজ ছিল। এখন কারিকুলাম ও পাঠ্যবই পর্যালোচনা চলছে। প্রত্যেক দেশেই নির্দিষ্ট সময় পর এটা করা হয়। শিক্ষায় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে সৃজনশীল পদ্ধতি। ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল, চিন্তাশীল এবং স্বাধীনভাবে লেখার সক্ষমতা তৈরির জন্যই এটি আনা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, তা উত্তরণে কাজ চলছে।

নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি : গত ২৭ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থী মূল্যায়নে ‘স্টান্ডার্ডাইজেশন’ (প্রমিতকরণ) নামে নতুন পদ্ধতির কথা প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। গ্রেডিং সিস্টেম বহাল রেখেই শিক্ষার্থীর ফল তৈরি করা হবে। এই পদ্ধতি অনুযায়ী, খাতায় প্রাপ্ত নম্বর সরাসরি শিক্ষার্থীকে দেয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বর থেকে ওই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের গড় সংখ্যা দিয়ে বিয়োগ করা হবে। এরপর প্রাপ্ত ফল ওই বিষয়ে সব শিক্ষার্থীর নম্বর প্রাপ্তির তারতম্য (স্টান্ডার্ড ডেভিয়েশন) দিয়ে ভাগ করা হবে। এরপর যা আসবে সেটিই শিক্ষার্থীকে দেয়া হবে। এই পদ্ধতি আনা হলে প্রতিবছর কত শতাংশ শিক্ষার্থীকে জিপিএ-৫ দেয়া হবে তা সরকারিভাবে নির্ধারণ করা হবে। এ পদ্ধতি প্রবর্তনে কাজ করছে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বেডু)।

পরীক্ষা পদ্ধতি : গত দুই দশকে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতি অন্তত তিনবার পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে- গ্রেডিং পদ্ধতি, এসবিএ (স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন) ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে এসবিএ চালু করতে গেলে এক শ্রেণীর শিক্ষকের দুর্নীতিতে হোঁচট খায়। এ পদ্ধতি অনুযায়ী শিক্ষক স্কুলেই শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করে নম্বর দেবেন। তখন শিক্ষকরা এ পদ্ধতিকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে নেন। পরে সমালোচনার মুখে এক বছরেই তা স্থগিত করা হয়। এখন ধারাবাহিক মূল্যায়নের নামে এ পদ্ধতিই আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা, ক্যারিয়ার শিক্ষা বিষয়ের মাধ্যমে চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এমসিকিউ : পরীক্ষায় সবচেয়ে বড় মৌলিক পরিবর্তন আসে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে। ওই বছর এসএসসিতে চালু করা হয় ৫০ নম্বরের এমসিকিউ। বাকি ৫০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেয়া হতো। এমসিকিউতে প্রতি বিষয়ে ৫০০টি এমসিকিউ প্রশ্ন নির্ধারণ করে দেয়া হয়। তার নাম দেয়া হয় প্রশ্নব্যাংক। সেখান থেকে প্রশ্ন করা হতো। উভয়টি মিলিয়ে তখন ৩৩ নম্বর পেলেই পাস করত পরীক্ষার্থী। ফলে এক শ্রেণীর শিক্ষার্থী রচনামূলক অংশের লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে শুধু ৫০০ এমসিকিউ মুখস্থ করেই পাস করত। এতে পাসের হার রাতারাতি বাড়লেও শিক্ষার মান পড়তে থাকে। এ অবস্থায় ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে প্রশ্নব্যাংক তুলে দিয়ে গোটা বই থেকে এমসিকিউ করা হয়। এতেও শেষরক্ষা হয়নি। এমসিকিউ প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষার হলে বলে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটতে থাকে। পরে এমসিকিউর পূর্ণ নম্বর কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু জেঁকে বসা দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। ফলে চলতি বছরের এসএসসি থেকে এমসিকিউ প্রশ্ন ৩০ শতাংশ করা হচ্ছে। কিন্তু এরপরও দুর্নীতি পিছু ছাড়েনি। চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় এই প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।

২০০৯ খ্রিস্টাব্দে হঠাৎ করেই চালু করা হয় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। পরের বছর অষ্টম শ্রেণীতেও একই ধরনের পরীক্ষা জেএসসি চালু করা হয়। শুরু থেকেই এ দুটি পরীক্ষা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও আপত্তি ছিল।

গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী ও বিশিষ্ট শিক্ষা এনজিও বিশেষজ্ঞ রাশেদা কে চৌধুরী ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা চালুর পক্ষে দৈনিক প্রথম আলোতে সাক্ষাতদিয়ে প্রশংসা করেন। তিনিই আবার ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে এ পরীক্ষার সমালোচনা করেন।

শিক্ষানীতিতে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করার সুপারিশ আছে। সে অনুযায়ী গত বছর মে মাসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষা কার্যক্রম হস্তান্তর করা হয়। বাস্তবায়ন কার্যক্রম এ পর্যন্তই। অপরদিকে প্রাথমিক স্তর অষ্টমে উন্নীত হলে জেএসসি পরীক্ষার দরকার আছে কিনা- এমন প্রশ্ন উঠেছে।

পোষ্টটি লিখেছেন: Polash Chowdhury

Polash Chowdhury এই ব্লগে 57 টি পোষ্ট লিখেছেন .

Loading...
পোস্টটি ভাল লাগলে লাইক দিন