রাজধানীতে ১৩ বছরের কিশোরীর আত্মহত্যার পর আরও ২ ‘ব্লু হোয়েল’ আসক্তের খোঁজ

ইন্টারনেটভিত্তিক প্রাণঘাতি ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের প্রভাবে রাজধানীর নিউ মার্কেট থানা এলাকার অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা নামের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর আত্মহত্যার পর মরণঘাতি এই গেম আসক্ত আরও দুই কিশোরের খোঁজ মিলেছে।

আজ রবিবার ওই দুই কিশোরের খোঁজ মিলে বলে জানিয়েছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ব্লু হোয়েলে’ আসক্তদের লক্ষণ উল্লেখ্য একটি সংবাদ আমার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করার পর দুইজন অভিভাবক আমাকে মেসেঞ্জারে ছবি তুলে পাঠিয়েছেন। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা খুবই গুরুতর।
তিনি আরও জানান, এক কিশোরের ভাই আমাকে তার ছোট ভাইয়ের হাতের ছবি মেসেঞ্জারে পাঠিয়েছে যা ‘ব্লু হোয়েল’ আসক্তদের উপসর্গের সঙ্গে মিলে গেছে। তার বড় ভাই তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে অপর কিশোর চিকিৎসকের কাছে যেতে অপারগতা জানিয়েছে বলেও জানান তাজুল ইসলাম।

এদিকে গতকাল শনিবার ঢাকার নিউ মার্কেট থানা এলাকার ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী এই গেম খেলেই আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয় তার পড়ার কক্ষ থেকে। আত্মহত্যার আগে ‘ব্লু হোয়েল’র কিউরেটরের নির্দেশ মতো লিখে যাওয়া একটি চিরকুট পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আত্মাহুতি দেওয়া ঐ কিশোরীর নাম অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা। ছিল তুখোড় মেধাবী। স্কুলের ফার্স্ট গার্ল হিসেবেই পরিচিত ছিল সে। ওয়াইডব্লিউসিএ হাইয়ার সেকেন্ডারি গালর্স স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্মিলিত মেধা তালিকায় ছিল প্রথম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয় ফার্মগেটের হলিক্রস স্কুলে। তার বয়স ছিল মাত্র তেরো। পড়ছিল অষ্টম শ্রেণিতে। হলিক্রস স্কুলে ভর্তির পর থেকে বদলে যেতে থাকে সে। পড়াশোনার জন্য সে ব্যবহার শুরু করে ইন্টারনেট। কয়েক বছর আগে থেকেই এনড্রয়েড মোবাইল ফোনও ব্যবহার শুরু করে স্বর্ণা। ফেসবুকসহ স্যোশাল মিডিয়া ব্যবহার চলছিল। এরই মধ্যে সবার অজান্তে সে ঢুকে পড়ে ইন্টারনেটের এক নিষিদ্ধ গেমসে। নিহত কিশোরীর পিতার সন্দেহ, তার আদরের মেয়ে ঢুকে পড়েছিল ইন্টারনেটভিত্তিক ডেথ গেমস ব্লু হোয়েলে। গত বুধবার দিবাগত শেষ রাতে সে নিজের পড়ার কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে। পরদিন বৃহস্পতিবার ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় নিউ মার্কেট থানাধীন সেন্ট্রাল রোডের ৪৪ নম্বর বাসা ৫বি ফ্ল্যাট থেকে। ব্লু হোয়েলের কিউরেটরের নির্দেশ মতো লিখে যাওয়া একটি চিরকূটও উদ্ধার করা হয়। তা এখন পুলিশের হাতে।

তাতে বড় করে লেখা, ‘আমার আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়।’ লেখা শেষে গেমসের নির্দেশনা মতো একটি হাসির চিহ্ন আঁকা।

সুব্রত জানান, ওই চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আমার আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়।’ এমনকি গেমসের নির্দেশনা মতো একটি হাসির চিহ্নও আঁকা ছিল।

ব্লু হোয়েল গেম কী? অনলাইনে একটি কমিউনিটি তৈরি করে চলে এ প্রতিযোগীতা। এতে সর্বমোট ৫০টি ধাপ রয়েছে। আর ধাপগুলো খেলার জন্য ঐ কমিউনিটির অ্যাডমিন বা পরিচালক খেলতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ দিবে। আর প্রতিযোগী সে চ্যালেঞ্জ পূরণ করে তার ছবি আপলোড করবে।

শুরুতে মোটামুটি সহজ এবং কিছুটা চ্যালেঞ্জিং কাজ দেয়া হয়। যেমন: মধ্যরাতে ভূতের সিনেমা দেখা। খুব সকালে ছাদের কিনারা দিয়ে হাঁটা এবং ব্লেড দিয়ে হাতে তিমির ছবি আঁকা। তবে ধাপ বাড়ার সাথে সাথে কঠিন ও মারাত্মক সব চ্যালেঞ্জ দেয় পরিচালক। যেগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এ খেলার সর্বশেষ ধাপ হলো আত্মহত্যা করা। অর্থাত্ গেম শেষ করতে হলে প্রতিযোগীকে অাত্মহত্যা করতে হবে।

কোথায় জন্ম: এই খেলার জন্ম রাশিয়ায়। জন্মদাতা ২২ বছরের তরুণ ফিলিপ বুদেকিন। ২০১৩ সালে রাশিয়ায় প্রথম সূত্রপাত। ২০১৫ সালে প্রথম আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়।

তবে এহেন গর্হিত কাজের জন্য নিজেকে অপরাধী না বলে বরং সমাজ সংস্কারক বলে নিজেকে অভিহীত করে বুদেকিন। সে জানায়, এই চ্যালেঞ্জের যারা শিকার তারা এ সমাজে বেঁচে থাকার যোগ্য নয়। এ গেম নিয়ে রীতিমত অবাক রাশিয়া পুলিশ। তদন্তের পর তারা জানায় অন্তত ১৬ জন কিশোরী এ গেমের কারণে আত্মহত্যা করেছে। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৩০ জনের আত্মহত্যার জন্য এ গেম দায়ী।

গেম কিভাবে তরুণ-তরুণীদের আত্মঘাতী করছে সে বিষয়ে চিন্তিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ব্রিটেন-আমেরিকায় এ গেম জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। যার ফলে সে দেশগুলো তাদের স্কুল-কলেজ সমুহে এ গেমের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে। তবে এ গেমের মূল অ্যাডমিন বুদেকিন আটক থাকলেও থেমে নেই তাদের কার্যক্রম। যার ফলে এ গেমের প্রভাব বিরাজমান। সম্প্রতি ভারতে এ গেমের ফলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

কেনো যুবক-যুবতীরা আকৃষ্ট হচ্ছে: শুরুতে তুলনামূলক সহজ এবং সাহস আছে কি না এমন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ায় তা যুবক-যুবতীদের কাছে আকৃষ্ট হয়। তবে একবার এ খেলায় ঢুকে পড়লে তা থেকে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।

খেলার মাঝপথে বাদ দিতে চাইলে প্রতিযোগীকে ব্লাকমেইল করা হয়। এমনকি তার আপনজনদের ক্ষতি করার হুমকিও দেয়া হয়। আর একবার মোবাইলে এই অ্যাপটি ব্যবহারের পর তা আর ডিলিট করা যায় না।

পোষ্টটি লিখেছেন: Saidul Islam

Saidul Islam এই ব্লগে 28 টি পোষ্ট লিখেছেন .

Loading...
পোস্টটি ভাল লাগলে লাইক দিন